Saturday, 26 July 2014

বেদী ও বাদ্য

নাজমীন চৌধুরী
বিদেশ বিভূঁই এ এসে প্রথম প্রথম চোখ কান খুব খাড়া রাখতাম; বিশেষ করে বাঙ্গালী পরিবেশে। কেমন যেন নিজের মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক সিদ্ধিলাভের অনুভূতি জেগে উঠত। যাকে সুক্ষ ভাবে বলে ভালো লাগা । বাংলাভাষা ও দেশের মানুষ গুলো কতো আপন!

কালের স্রোতে খাপ খাইয়ে নেয়া প্রতিষ্ঠিত অভিবাসীদের কাছে একে একে কতকিছু জেনেছি। অসাধারন মনবল তাঁদের! প্রতিটি মুখই অনেক অনেক পাতায় লেখা এক একটা ইতিহাসের বই। একান্ত নিজের।

তখনও কম্পিউটার ততোটা প্রসার ও প্রচার পায় নি। দেশ থেকে আসা শিক্ষানবিশ পরিচিতগন ও স্থানীয় অভিবাসীদের সাথে সামাজিক যোগাযোগ হতো ফোনে আর আমন্ত্রণ/নিমন্ত্রন পর্বে। সে কত কথা, কত দিন এবং কত স্মৃতি । ভাল-মন্দ হিসেব করতে হলে বলব, ভালর পাল্লাটাই ছিল বেশী ভারী।

ওরকম একদিন। আতিথ্যকর্তার বাড়িতে আমদের ভীড়। প্রায় তিরিশটি পরিবারের সমাবেশ। দু’একজন বাদে সবাই নির্ধারিত সময়ে এসেছেন। অভিবাদন বিনিময় শেষে নিজেদের মত আয়েশ করে বসা। তারপর বিভিন্ন বিষয়ে কথা বার্তার শুরু। এমন সময় অল্প বয়সী ক’জন ছেলে মেয়ে এসে ফলের রস নিয়ে চলে গেল উপরের ঘরে। একজন মা তার ছেলেকে উদ্দ্যেশ্য করে বললেন, “খাবার খাবে না। জুস পেলে আর কথা নাই”।

আমিও অতিথিদের সাথে বসে তাদের গল্প শুনি। বাবামায়েরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের কথা নিয়েই ব্যস্তঃ স্কুলে খুব ভাল করছে, ক’জন পিয়ানো তে অনেকটা এগিয়েছে, অনেকেই কুরআন পাঠ শিখছে এরকম বিভিধ কথার বিন্যাস। সবার ভাষ্যেই এক ধরনের সুখের ছোঁয়া, চোখে উজ্জ্বল তৃপ্তি!

ওসব আলচনার এক বিষয়ীর নাম সুপ্ত। সুপ্তর জন্ম ও বেড়ে উঠা দুটোই ব্রিটিশ রাজ্যে। আমরা সেদিন ওদের ঘরেই আমন্ত্রিত। শাহী খাবার, সবাই খুব মজা করে খাচ্ছি। আমদের আসরে সুপ্তের পদার্পণ একটু দেরীতেই বইকি। হঠাৎ এক জনইকার ইশারা আ্মাদের দৃষ্টি কাড়ে। সরল সোজা অন্য বেচারী সেই ইঙ্গিত না বুঝে বলেই বসলো, “কি হইছে?”

তৎক্ষণাৎ অতি চতুরীর হস্তক্ষেপ, “ধীরে ধীরে খাও, বাবা; গলায় বাঁধবে”।
ব্যস, যেন সবার বোঝা সারা। কি জানি কী বুঝলাম! তা থাকগে। সম্পর্কে এক আনটি প্রশ্ন করল, “সুপ্ত, তুমি রোজা রাখছ?”

না, সংক্ষিপ্ত জবাব তার।
খাবার শেষ করে ও চলে গেল। সবার চোখে চোখ রেখে মিষ্টি হেসে বিদায় নিল নিজের ঘরে। ওর সাথে আমরাও কুশল বিনিময় করি। আদবকায়দা ও চেতনাবোধের উপস্থিতিটা অনুভব করি প্রাণ দিয়ে। তুষ্ট হয়েছি খাবার খেয়েও। সে আর ভাষায় বলা!

বেশিরভাগ নিমন্ত্রিতরাই একমত, খাওয়া বেশী হয়ে গেছে। খানিক্টা সময় প্রয়োজন। ফলে, প্রধান খাবার ও মিষ্টান্নের মাঝে বিরতি। আর বিরতিতে নানান কথার মেলাঃ দেশী-বিদেশী রাজনীতি, রাজনীতিবিধদের নিকুচি করণ, সেরা ধর্মের গুনাগুন, অমার্জনীয় আচার/আচরন ও আরও কত কিছু! রাজনীতি বিষয়ে আমি একবাক্যে বোধির, এ প্রসঙ্গে কথা শুনতে ভাল লাগে না বলে শুনি না। এই ভাষাটাকে খুব কঠিন লাগে জন্য বলাও শিখি নি। তো পাশের ঘরের লোকজন কি করছে জানতে উঠে পরি। সেখানেও আলাপ-চারিতা; এক চমকেই মুখরোচক মনে হোল। কোন শাড়ীর দাম কতো, কে কে দেশে যাচ্ছে ঈদ করতে, কার যেন চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে, হবু বউ ইউরোপের ... ।
“ছেলের ত বিয়ের বয়স হোল, মেয়ে-টেয়ে খুঁজছেন কি”? মাথায় গোলাপি ওড়নার মধ্য বয়সীনি জিজ্ঞেস করেন সুপ্তর মাকে । অংশ নেবার জন্যই বুঝি উনি কিছুক্ষন থেকেই নেড়েচেড়ে উঠছিলেন।

“না আমরা কিছু ভাবি নি তবে ওর একটি মেয়েকে পছন্দ”।

- বাঙালি না কি সাদা? সাথে কৌতুহুল মাখা দৃষ্টি তার।

“বাঙ্গালী না রে ভাই, সে কপাল নিয়ে জন্মাই নি!” তাঁর দীর্ঘশ্বাস ঘড়ের বাতাসটাকে কুয়াশায় ভরে দিল যেন। “এদেশে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কি যে অশান্তি!”
ক’জন সুপ্তর মাকে সায় দিলেন হ্যা সুচক মাথা নেড়ে।

সবুজ শাড়ীতে পরিপাটি মহিলা আশ্বাস দিলেন, “ বাঙালী হতেই হবে এমন কোন কথা নেই। মুসলমান ঘরের কত মেয়ে আছে!”

সুপ্তর মা কি ভাবলেন জানি না। উনি নির্দ্বিধায় বলে গেলেন, “না না মেয়েটির জাতকুল তেমন জানিনা। শুধু জানি যে ও সুপ্তের সাথে একই স্কুলে পড়ত। সেখান থকেই জানা শোনা, উঠা বশা, প্রেম ও বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ। মেয়েটিকে ভালই মনে হয়। সামনের জুলাই তে ওদের বিয়ে।“

- মেয়ে মোসলমান হচ্ছে তার আগে নিশ্চয়?

“সুপ্ত এ ব্যপারে ত কিছু বলে নি,” মায়ের উত্তর।
“ওমা সে কি কথা!” বলে নিমন্ত্রিতা জিভে কামড় দিলেন। এ কোণ অনাসৃষ্টির কথা, ভাবখানা অনেকটা সেরকমই।
প্রসংগ যখন তুঙ্গে আরোহণ করছে, ঠিক তক্ষুনি আসর ভাঙ্গল একজন চাদর চাইতে এসে। তাঁর ব্যাখ্যা, লোকজন বেশী, শুধু জায়নামাজে যায়গা হবে না।
সুপ্তর মা চাদরের ব্যবস্থা করে দিয়ে ফিরে এলেন আমাদের মাঝে। মুখের হাসিটা তখনও ধরে রেখেছেন।
“যুগ বদলে গেছে ভাবী,”
এবার ওনার বলার পালা – “দাদী/নানীদের কালে ছিল বাল্যবিবাহ প্রথা। মা খালাদের বিয়ে হতো, আর আমাদের সময় বর পছন্দ না হলে বাবা মা কে তা জানিয়ে দেবার সুযোগ হয়েছিল। অনেকেই ভালবাসার জ্বালেও আটকা পরেছি আমাদের প্রজন্মে। জাহোক, অত কথায় আর যাই না। আমাদের ছেলে-মেয়েরা বিয়ে করবে সঙ্গীকে জেনেশুনে, এটাই ত চলছে এখন এবং তাই হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি! ওদেরটা ওদের ‘পরেই থাক না। যথাসাধ্য ভাল মন্দ জানিয়েছি, লেখা পড়া শিখেছে, বয়স হয়েছে, বাকিটা তাদের নিজেদের”।

“ঠিক বলেছেন,” মুখ খুললেন এক সমজদার।
“দেশেও ত তাই চলছে!” গল্পে গল্পে বললেন ওনার চব্বিশ বছর বয়সী মেয়েটির বিয়ের প্রতি খুব অনীহা। আয়নির জন্ম দেশে তবে ওর বেড়ে ওঠা এখানে। গ্রীষ্মের ছুটিতে দুই/তিন বছর পর পর দেশে বেড়াতে গেলেও সে শুধু ওখানকার বাংলা ভাষা ও আত্মীয়-আদর টাকেই বেছে নেয়। ওনার হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার ঢংটা বেশ সাবলীল মনে হোল। উনি বলেই চললেনঃ
জানেন, ওর এক বান্ধবীকে তার বাবা মা দেশে নিয়ে গিয়ে মামাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়াছিল। আয়নির এই ধরনের বিয়েতে তীব্র ঘৃণা। শুধু তাই নয়, তার বান্ধবী ভয়ে প্রতিবাদ করে নি বলেও সে ক্ষিপ্ত। আয়নির নিজের চোখে দেখা অনেকেরি বিয়ের সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে! ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কতোটা দায়ী সেটা আঁচ করা কঠিন, তবে দুজন মানুষ সম্পর্ক থেকে বিচ্ছেদ নেয় নিশ্চয়ই কোন গভীর কারনে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আয়নির মা প্রকাশ করেন তার বিহ্বলতার কথাও। কোনটা ভাল কোনটা খারাপ, তা বলা বেশ কঠিন বলে জানান তিনি। তাঁকে ভাগ্যবিশ্বাসেও সংবেদনশীল মনে হয়েছে বইকি! সব বাবা মাই চায় তাদের ছেলে-মেয়ে সুস্থ থাক, সুখে থাক। তিনিও তাদের সাথে একমত বলে ঘোষণা দেন।
“এযুগে কাউকে জোর করে ত আর বিয়ে দেয়া যায় না; আর ভিন ধর্মী কাউকে বিয়ে করলেই বা ঠেকাবেন কি করে?” তাঁর নিগুঢ় প্রস্নে উদ্বেগের মাত্রাটাই গেল বেড়ে।

বেশ বিরক্ত হয়েছিলাম, মনে পড়ে। কিসের মধ্যে কি! এত মজার মজার খাবার খেয়ে চিত্ত হবে উতফুল্ল, তা না! ছেলে-মেয়ে নিয়ে একঘেয়েমিপনা।

রাতের গভীরে ঘরে ফিরে আমরা দুজন এসব ছোটোখাটো গল্পমালা ভাগাভাগি করিঃ
কয়েকটা পরিবার একসাথে কিছুক্ষন মাত্র। কেউ বা অন্যের চলাচল ও আনুসাংগিকতা নিয়ে অখুশী। আবার কেউ বা একে অন্যের ভুলত্রুটি শুধরে দিতে অবলীলায় একটুখানি হাঙ্গামাও বাঁধাল। এঁরা জন্মভূমি ছেড়ে এসেছে বিভিন্ন প্রয়োজনে। অনেকেরই আকাঙ্ক্ষা মিটেছে; সেকারনেই পাশ্চাত্তের সুযোগ সুবিধার গুন বিশ্লেষণেও তাঁরা আন্তরিক। পরবর্তী প্রজন্মকে বড় এবং শিক্ষিত করে তোলার পথ আকাশের মত উঁচু ও উন্মুক্ত তাঁদের। তবে জীবন-মরণের সীমান্তে চূড়ান্ত সুখের চাবিটা হাত করতেই বংশধরদের পাশ্চাত্য কায়দায় জীবন যাপনের ধারাপাত নিয়ে, টানা হেচরার চেষ্টাও অটুট রেখেছেন তাঁরা।

ঠিক তাই! দুই যুগ বড় বেশী সময় নয়।বাবা-মা যেমনটি বলতেন। মধ্যারণের ছায়ায় আজ আড়চোখে দেখি - আমিই সুপ্ত ও আয়নির মা, অভিবাসী ও বিতর্কিত! ঘোর কেটে বেদীতে বসে বাজাই বাদ্য।

২০১৪ জুলাই ২৬
ক্যানাডা


Lilac Leaves ♥♪♥ Geranium :: Composition: SNC
Photo Credit: SAI, VCV

No comments:

Post a comment