Showing posts with label নাজমীন চৌধুরী. Show all posts
Showing posts with label নাজমীন চৌধুরী. Show all posts

Sunday, 23 November 2014

পড়শি-পথে পদচারণা

নাজমীন চৌধুরী
হঠাৎ মনে হোলো ওরা ঘরের বাইরে আসতে পারে; আগে থেকেই একটু খাবার দিয়ে রাখি! বারান্দার নীচে খরগোশ পরিবারকে গাঁজর দেবার গোপন প্রয়াস। তাপমাত্রা দশে (১০ সেলসিয়াস) উঠেছে আজ; আর আবহাওয়াও খুব ভালো।  আমাদের খরগোস প্রতিবেশীদের সাথে সখ্যতা করতে চেয়েছিলাম এর আগেও, বেশ ক’বার; কিন্তু ওরা দ্বিমত পোষন করেছে, প্রতিবারই। এরপর আমি খ্যান্ত দিয়েছি। তবে আমি চুপি চুপি খাবার দিই আর ওরা চুপি চুপি খেয়ে যায়। কখনও চোখা চোখি হলো তো রক্ষা নেই। তেড়ে দৌড়ে আড়ালে ছোটে! ছুটটা নিজের ঘরেও দেয় না; একদম গেটের নিচ দিয়ে বের হয়ে কোথাও চলে যায়। মনের ভয় কাটলে তবে ফিরে আসে।  আমি বুঝি, জোর করে বন্ধুত্ব করা চলে না।

গতরাতের বৃষ্টিও বরফ গলতে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। ঘাস জেগে উঠেছে আপন শক্তিবলে। শরতের সদ্য ঝরা পাতা মাটি আঁকড়ে ধরে যত্রতত্র ঘোষণা করছে ওদের অস্তিত্বের কথা।

এত সুন্দর বিকেল;  চার দেয়ালের বাইরে কিছু একটা করা যায়! নিজেকে তৈরি করে হাঁটতে বের হলাম। অনেকদিন প্রতিবেশী পথ গুলোতে হাঁটা হয় না। হাঁটি আর সবিস্ময়ে এদিক সেদিক তাকাই। বরফের সাদা রঙই এখানে  কাল একচেটিয়া রাজত্য করেছিল। হাঁটি, দেখি আর মাঝে মাঝে শান্তিপূর্ণ দীর্ঘ শ্বাস নিই। বাড়ির সামনের গাড়ি গুলো সদ্য ধৌত কাঁচের গ্লাসের মত স্বচ্ছ! বৃষ্টিস্নাত! পাতাহীন গাছ-পালা গুলোও খুব তৃপ্তি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে পেলাম, প্রায় প্রতিটি গাছেই দুএকটা উন্মুক্ত পাখির বাসা। মনে হোল যেন সেগুলো অপেক্ষায় বসে আছে; যদি মালিক ফিরে আসে কোন এক বসন্তে!  লিলিউডের শেষ মাথায় চার নম্বরের মানুষটি আচমকা মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে গোটা পড়শিকে জানান দিল, তাতে বিন্দুমাত্রও ভুল নেই! নভেম্বরের শেষান্তে সুন্দর আবহাওয়া পাওয়া দুস্কর; তাই মোটরসাইকেলে সেও একটুখানি ঢুঁ দেবে বোধ করি।

লিলিউড চুকিয়ে নিকলসন ধরে দক্ষিনে হাঁটছি; আশেপাশে তাকিয়ে দেখি শুধু আমিই, আমি ছাড়া আর কেউ নেই রাস্তায়। আরও খানিক্ষন হেঁটে একজনকে পেলাম। মই বেয়ে তাঁর ঘরের রুফ টপে উঠছে; হাতে একগাদা দড়িআঁটা বাল্ব। ক্রিস্টমাস উপলক্ষে লাইট দিয়ে বাড়ির চালা সাজাবে। মনে মনে ওঁকে আশীর্বাদ করলাম।  মানুষের কত গুণ! কত কাজ করতে জানে এঁরা! ঠিক তক্ষুনি একটা গ্যারেজের দরজা পলোট মুড়িয়ে উঠে গিয়ে তিন/চারটি যুবকের অট্টহাসির ধ্বনি  বাতাসে মিশিয়ে দিল।

হ্যাস্কেলের মোড়ে পা দিতেই নিমিষে একটা হাঁসফাঁশ শব্দে সচকিত হলাম। একশ ষাট নম্বর বাড়ির কুকুরটি ঘেউ ঘেউ শব্দ ছাড়াই আমার কাছে পৌঁছে গেছে, আমি তখনো ওদের সীমানা থেকে দুই বাড়ি দূরত্বে। কুকুরটি আমার বাঁ হাতে পরা ম্যেপল পাতা অলঙ্কিত লাল গ্লভটা শুঁকে নিয়ে আমার দিকে তাকালো। ইতিমধ্যে প্রভু উচ্চকন্ঠ্যে - রাইলি! হোম, নাউ!!
আমিও একমত পোষণ করি, ‘গো হোম, রাইলি!’

আবার হাঁটছি। ইস, প্রতিটা দিন যদি এমন হতো! কোথাও ব্যস্ততার ছোঁয়া নেই। অথবা থাকলেও আমি তা দেখতে পাচ্ছি না। বেসিরভাগ বাড়ির পারকিং লটে গাড়ি বসে। যে দুএকটি বাড়িতে গাড়ি দেখছি না, তাঁদের টা হয়ত গ্যারেজে, কিংবা দোকান-পাটে বা রেস্তোরায় অথবা অন্য কোথাও। কিছু কিছু লোকজন ভ্রমনেও আছেন এখন; এসময় ভ্রমন বিলাস সাধারনত গরম দেশ গুলোতেই। তাঁদের সব আনন্দস্থান ও আমার মনপটে আঁকা বীচের কথা ভাবি, হাঁটি আর সতেজ শ্বাস টানি। চলছি আমি। মাঝে মধ্যে সান্ধ্য খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসেঃ উত্তপ্ত ওভেনের কড়া পোড়া গন্ধ, ক্ষুদা জাগানো বারবেকিউয়ের এরমা; এমনকি দারুচিনি দিয়ে মাংস রান্নার সুগন্ধও। কয়েক মুহূর্তেই ওয়েস্ট-পয়েন্ট ও ব্রুক-লেনের সন্ধিক্ষনে চোলে এসেছি। কানে এলো পাখির কলরব। কিচির মিচির শব্দের উল্লাস। চোখকান দিয়ে খুঁজতেই দেখি একটা ঘুঘু তার উষ্ণ পালকের নিচে ঘাড় গুঁজে লাইটপোস্টের 'পরে বসে আছে। একা। নড়া চড়া করছে না। বেশ শান্তিতে ঘুমোচ্ছে বলে মনে হোল। ওর শান্তি আমাকেও আশ্বস্ত করেছে বৈকি! আমি দাঁড়িয়েই আছি। ঘুঘুটাকে দেখছি। পাখির কলরব শুনছি। দশ-বার বছরের এক কিশোরী ওর কালো পুডল্কে কোলে নিয়ে কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, টের পাই নি। পাখির  কিচির মিচির শব্দের ভলিউম বেড়ে হৈহুল্লর পর্যায়ে উঠে যাচ্ছে, মুহূর্তে মুহূর্তে! আমরা শুনছি।

– হুম! পেয়েছি! এই তো, সিডার ঝোপে!

বাংলো বাড়িটার উত্তরপশ্চিম কোণের ঝোপএ এক ঝাঁক পাখি (খুব সম্ভবত সিডার ওয়াক্সউইং) নাচের তালে উড়ছে, সাথে  কলরবও অটুট! গভীর শীত এড়াতে এই পাখিসব দক্ষিনে কবে যাবে, আদৌ যাবে কি না জানি না; তবে, আজ ওরা দলবেঁধে মহানন্দে চঞ্চল।

নভেম্বর ২৩/১৪
বিকেল ৫ টা
ক্যেম্ব্রিজ, অন্টেরিও, ক্যানাডা
Picture Credit: Vision Creates Value VCV
  • 11 people like this.
  • Altafuzzaman Nayem কোনো কোনো লেখক এমন জমিয়ে গল্প লেখেন যা শেষ পর্যন্ত না পড়ে মুক্তি নেই; শরৎচন্দ্র পারতেন, বিমল মিত্র পারতেন। আবার কোনো কোনো লেখক এমন লেখা লেখেন যা পড়তে বসে না ভেবে উপায় নেই। পড়া আর ভাবা তো সমান তালে চলে না। যেমন তারাশংকর, সতীনাথ ভাদুড়ি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার এমন কিছু লেখক আছেন যাদের লেখা পড়ে মনেই হয় না যে গল্প পড়ছি, মনে হয় জীবনের ছবি দেখছি। এই যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

    সুবোধ ঘোষ বা পরশুরামের মতো শুরুতেই চমকে দিতে না পারলেও সল্প সময়ের জন্য হলেও আপনি কিন্তু আমাকে আপনার পাড়া/মহল্লাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।  হ্যাঁ, আমার মনে হচ্ছিল যেন আপনার পড়শিতে পদচারণা প্রতক্ষভাবে দেখছিলাম। 
  • Nazmeen Chowdhury Thanks for your constructive comment , Nayem. It helps when you receive a readers point of view! 
  • Asma Sabbir নাজমিন আপা আপ্নার বাসার পরিবেশটা অসাধারণ।
    23 hrs · 1
  • Nazmeen Chowdhury Thank you all!

Sunday, 7 September 2014

পুনরাবৃত্তি ~ নাজমীন চৌধুরী

-‘ওহ! দেখো, কতো সুন্দর! এটা কিন্তু আমার চাই-ই চাই!’

দোকান-পাটে গেলেই দেখি ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। বাবা-মায়ের সাথে কেনাকাটায় ব্যস্ত ত্রস্ত। তাদের চাহিদার বস্তু গুলোও বেশ রকমারি। মূলত খেলনা থেকে শুরু করে ক্যান্ডি, চকোলেট, জামাকাপড় ও অগুনিত সংখ্যার তালিকা।  কিছু কিছু সময় বাবা-মায়েরা দু'একটা আবদার পালন করেন আর অনেকবার বাধ্য হয়েই কিনে দেন। সে আমার চোখের দেখা। বাধ্য হবার অনেক কারণ। তার মধ্যে সর্বচ্চ কারণটা হোলঃ নিজ সন্তানের আর্তনাদ ও বেদনাজড়িত শব্দমালা বাবা-মায়ের 'পরে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, তা এড়াতে। অন্ততঃ আমি তা মনে করি। এই এত্তটুকুন ছেলে-মেয়ে এমন বিরহভাব ও অঙ্গ-ভঙ্গি করে যে তার প্রার্থিত দ্রব্যটি না পেলে সে মরেই যাবে। কি করা আর। এত সামান্য ব্যাপার ত মরণ ডেকে আনতে পারে না! বাঁচতে হবেই, বাবা-মা ও সন্তানাদি, সবাইকে।

আমি নিজেও আপন সন্তানকুলের এই সব আবদার থেকে রেহাই পাই নি। যথাযথ নিয়মেই সাড়া দিয়েছি, ঘুরে ফিরে বার বার। বেঁচে থাকা ন্যায্য ধর্ম এবং ওদের খুশীই আমার তৃপ্তি।

নতুন স্কুল বর্ষ শুরু হবার আগে দেখি বিভিন্ন আবদারের আরও বেশী হিড়িক পড়ে যায়। আর প্রতিবারই মনে হয় ঠিক এই সময়টাতেই ছেলেমেয়েরা যেন আর একটু বেড়েও যায়। তাদের মাপ ও ধাপ উপরে উঠতে থাকে। তাই ছোটো খাটো, পুরনো ও অপ্রার্থিত জিনিষপত্র কেটে ছেঁটে ফেলা ঠিক এই সময়েরই রেয়াজ বটে। এবারেও ক’দিন আগে রাজ্যের জিনিসপত্র বাছাবাছি করছিলাম। ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে গেছে, হাবিজাবি কিছু জিনিষ বাতিল করতে হয়।
-'যা দরকার নেই, তা ফেলে দাও'।

কাজের/অকাজের জিনিসপত্র ভাগাভাগি করতে গিয়ে ওরা এটা নিয়ে বসে, সেটা নেড়ে-চেড়ে দেখে আর স্মৃতিচারণ করে। জিনিসপত্র ঘাটতে ঘাটতে একটু পরপরই অট্ট হাসিতে ঘরদোর ভরে তোলে। আবার দেখি পরস্পরের মাঝে একটু-আধটু খোটাখোটিও লেগে যায়। কি অনাবিল মনন এদের! আমি মধ্যস্ততা করতে বলি,
-‘জিনিসগুলো ফেলে দিচ্ছ, সুতরাং কার কোনটায় মালিকানা, তা নিয়ে মাথা কাটার প্রয়োজন তো দেখি না।‘

যুক্তিটা ওরা গ্রহণযোগ্য মনে করে, বোধ হয়। কারণ নিজ নিজ কাজে বসে যায় আবার। ফলাফল কষে বেশীরভাগ জিনিসপত্রের যায়গা হয় রিসাইক্লিন পাত্রে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আর ভাবিঃ আহারে! অতিরিক্ত চাওয়া-পাওয়ার কি হাল! ঘরে নিয়ে আসার পর সেসবকে নিয়ে বিলাস ভাজন ছিল হাতে গনা ক’দিনের। তারপর বাসী-খাবারের মত এঁটো ভাঁগাড়ে ওগুলোর স্থান। কিন্তু তাদের সেই অতি আকাঙ্ক্ষিত বস্তুগুলোকে আমি অবহেলা করতে পারি নি, চট করে। সুতরাং  সিন্দুকে তুলে রেখেছিলাম সেগুলো, যত্ন প্রলেপে। একে একে কত সিন্দুক আমার! কার্ড বোর্ডের বাক্স দিয়ে তৈরি সিন্দুক। সিন্দুক বলব না কেন? বাক্স ভর্তি জিনিসগুলো পয়সা দিয়ে কেনা। নিজের পয়সার দাম আছে না। আর আকুলি-বিকুলিমাখা স্মৃতির মালা? তাই কি না আমার এই সিন্দুকবিলাস।

বাছ-গোছের সময় কে যেন হঠাৎ একটি বাক্স থেকে সিন্দুকভর্তি কার্ড বের করলো সেদিন। বিভিন্ন খেলোয়াড়দের ছবিওয়ালা কার্ড ও ইউগিউ কার্ড। কতগুলো বর্ণীল  ও কতগুলো ভেলভেটে মোড়ানো। কম, বেশী ও মাঝারি মূল্যের। স্মরণে এলো কিছু প্যকেটে থাকতো ছয়টা কার্ড ও কোনো প্যকেটে চারটা। সবচেয়ে দামীগুলো কেনা হোতো এক প্যাকেটে শুধু একটা কার্ড।

সবাই মিলে কার্ডগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিলাম; সাথে ছিল সুখ রোমন্থন। এরই মাঝে, বাড়ন্ত ও সুবুদ্ধির অধিকারী সন্তানটি তড়িৎ বেগে আমাকে আর একবার চাক্ষুষ বোকা বানিয়ে বলে - ‘ইস,  কী অপচয়! আমাকে থামাও নি কেন? কেন বারন কর নি এই অনাবশ্যক কার্ডগুলো কিনতে? ওই টাকা দিয়ে এখন কতকিছু পাওয়া যেত!’

ক্যানাডা
সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৪




Roses ♥♪♥ Mint ♥♪♥ Chives :: Improvisation SNC 2014 Summer & Spring :: PC: VCV

Friday, 15 August 2014

নাম দিয়ে কাম কি?

নাজমীন চৌধুরী

' বৃক্ষ তোমার নাম কি? 
- ফলে পরিচয়!'
ছোট বেলায় এটা শুনলেই বেশ একটা ধাঁধায় পড়ে যেতাম। আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, বরই ও লিচু এবং এরকম আর কিছু ফলের গাছপালা খুব ভাল করে চিনতাম। আর মনে মনে ভাবতাম যে সব গাছপালা অচেনা তাদের ফুল-ফল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! ছোটবেলার সেই আক্ষরিক জ্ঞানকে আমি তুচ্ছ মনে করি না।  'বৃক্ষ পরিচয় তার ফলে' আর সাধারণ নিয়মে মানুষের পরিচয়টা আসে প্রথমত তার নাম থেকে (পারিবারিক নাম, দেয়া নাম, অর্জিত নাম, উপাধি ... তা সে যে নামই হোক)। 
তাই জন্মের আগেই আমার মা আমার ঠিক করে রেখেছিলেন - আমার নাম হবে ইয়াছমীন। কি জানি উনি কেমন করে জানতেন আমি মেয়ে হোয়ে জন্মাব, সে যুগে তো সনোগ্রাফি ছিল না। ছেলে হোলে কি নাম রাখতেন জানতে চেয়েছি অনেকবার, উত্তর মেলে নি। নামটা ফাঁশ না হয় যাতে বোধ হয়। আলট্রা-সাউন্ড তো দূরের কথা, আমার জন্মলগ্নে উনি ডাক্তার বদ্যিও পান নাই; অজ গাঁয়ে জন্মেছি। তবে আমাকে ভূমিষ্ঠ করতে মা’র সব কষ্টের কথা শুনেছি। বাকি ভাই-বোনদের জন্মবেদনা গুলোকে একসাথে করলেও তা অতটা কষ্ট নয়, উনি বলেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীনিরা বলেছেন। ব্যাপারটা জানলে নিশ্চয় ওভাবে কষ্ট তাঁকে আমি দিতাম না। যাক, নাম প্রসঙ্গে ফিরিঃ আমার নামকরণ নিয়ে মা এত উৎসুক ছিলেন যে উনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওরফে চাচাতো বোনটিকে সেটা জানান। হায়রে কপাল, মা’র চাচাতো বোনের মেয়ে আমাকে টেক্কা দিয়ে উনত্রিশ দিন আগে জন্ম নেয়। মা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন আমার নামটা কয়েকটা দিন আগে তার হাত-ছাড়া হবার কারণে। তা আর কি করা। পরে খুঁজে খুঁজে, বাকি ভাই-বোন দের নামের সাথে মিল রেখে উনি আমার ডাক নামটা রেখেছেন।
কতগুলি বছর কাটল আমার সেই নামে। কারও আপত্তি শুনিনি তা নিয়ে। ঘর ছাড়া হতে হোল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। হলে বসবাসের শুরু। কি সেই আনন্দ! একে একে অনেক বন্ধু পেয়ে গেলাম। নাম জানতে সবাই আমাকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করে, “নাজনীন?” আমি আবার বলি, “নাজমীন!” কেউ এ নাম কখনো শোনে নি আগে। আমার তাতে কিছু যায়-আসে না। আমি শুধু আমার নামটা কয়েকবার বলি যাতে তারা ঠিক মত শুনতে পায়, সেই আশায়। তিন দিন না যেতেই এক বন্ধু বলল, “শোন, আজ থেকে তোর নাম হলো নাজু। কেউ তোকে নাম জানতে চাইলে বলবি, নাজু!” আমি তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলি, “কেন?” তার খুব সোজা উত্তর, নাজু শুনতে আধুনিক। খুশী হলাম আধুনিক নাম পেয়ে। তারপর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই  আমার গেঁয়ো নামটা গেলাম ভুলে। আধুনিক ত হতেই হয়। পিয়ার-প্রেসার। ক’সপ্তাহের ভেতর বিশ্ববিদ্যালয়ে যথারীতি গণ্ডগোল!  হল ভ্যাকেট। বাড়ি গেলাম। সপ্তাহ ফিরতেই চিঠি। বন্ধুর চিঠি। মা তো পিয়ন চাচাকে বললেন, “এটা আমাদের চিঠি না গো। এই নামে এই বাড়িতে কেউ নেই”। ওদের কথা শুনে একটু এগুলাম টিনের ফটকের দিকে। কার চিঠি মা? আমাদের না, মায়ের উত্তর। চাচাকে বললাম, একটু দেখি। উনি চিঠিটা আমকে ধরিয়ে দিতেই আমি বলে উঠি “সেকি?” এটা আমার চিঠি মা! আমার বান্ধবী লিখেছে, রাজবাড়ি থেকে। পিয়ন চাচা আমার হাতে চিঠিটা দিয়ে কেটে পড়লেন। বেচারা না জানি কতটা ভেবেছেন আমাকে নিয়ে সেদিন। 
মাকে আদ্য-পান্ত্য বুঝিয়ে বলি আমার নামের বিবর্তন প্রসঙ্গে। আমার মাও বেশ আধুনিক মনা। উনি ব্যাপারটা খুব সুন্দর দৃষ্টিতে নিলেন। আর নিবেনই বা কেনো? তার পছন্দের নামটা তো  দিতে পারেন নি। মায়ের চিন্তা-ধারায় যুক্তি ছিল এই যে, বাড়িতে যখন উনারা নায়র যাবেন, তাঁদের দুটো বালিকার একই নাম ভালো ত শোনাবেই না, বরং মানুষ ওদের বয়সটা জেনে ফেললে আমার মাকে কপি-ক্যাট মনে করবেন। তাতে মায়ের আপত্তি ছিল প্রবল। বিধায় আমাকে অন্য আর এক নাম দিতে হোল তাঁর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু আমার নামটা ত শুধু ছাঁটলই না একটু জোড়াতালি দিয়ে বেশ আধুনিক করে ফেললো। আমার নাম রাতারাতি বদলে যাওয়ায় অনেক আত্মীয়–স্বজন এবং প্রতিবেশীরা বললেন, “ঢং দেখোনা! যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কেউ পড়ে না!”
তথাস্তু! নাম বদলে গেল বলে তো আর আত্মীয় হারা হয়ে গেলাম না। দুই পক্ষই থাকা চাই।
আমার নাম নিয়ে বিড়ম্বনার শুরু মাত্র। বিয়ের পর অর্ধাঙ্গও দিলো নামের অর্ধেকটা কেটে, তাঁর মত করে। সে কারও টাই মানলো না। বলে কোন ‘মীন’ জিনিষই তার পছন্দ না। আমি দেখি বিপদ সংকেত। এখন কি করা! উনি বলেন আমার নাম হোল “নাজ”। আমি বলি নাজুতে কোন মীননেস নেই। সে বলে, “ওটা বন্ধুদের দেয়া নাম, তাতে কোন বিশেষত্ব নেই। অনেকটা ফ্যেক  নামের মত!” বিপদের উপর বিপদ, আমার নাম নিয়ে বিপদ। সেই খালা সম্পর্কীয় আত্মীয়ার উপর খুব রাগ হোল। তার মেয়ের উপরও। ইয়াছমীন খুব মিষ্টি একটা নাম, আধুনিকও। কেউ তা বদলাতে চাইত না নিশ্চয়!    
বিয়ের পর দেশ ত্যাগ। বিদেশে পা দিতেই টনক নড়ে গেল। এখন থেকে সার্টিফিকেটের নাম চলবে। কিন্তু সার্টিফিকেটে চোখ বুলিয়েই মাথায় হাত! কোথাও আমার মা, বন্ধু ও অর্ধাঙ্গের দেয়া নাম নেই। গলা শুকিয়ে কাঠ! মনে মনে নিজের নাম মুখস্ত করলাম যাতে ফস করে আবার উল্টাপাল্টা নাম না বলে বসি। বিভিন্ন নাম বললে টেররিস্টের দলে পড়ার বিপুল সম্ভাবনা।
ডাক্তারের ডাক পড়ল রুটিন চেক-আপের। তোমাদের ফ্যামিলি নাম আলাদা কেন? প্রশ্ন শুনে একটু সময় নিয়ে ভাবলাম। তারপর সাধ্যমত কালচার তুলে আনলাম।  বললাম, এটা আমাদের দেশে ব্যপার না। একটু জোকও করলাম। দেখো আবার যদি অন্য কাউকে বিয়ে করি, বার বার নাম বদলানো --- ইত্যাদি ইত্যাদি। ডাক্তার সাহেব কতটা তুষ্ট হয়েছিলেন জানার চেষ্টা করি নি। মনে মনে ভেবেছি, হ্যু কেয়ারস? হোয়াট-এভার!
শিখতে না শিখতেই ওদেশের পাট শেষ।
এবারে শুরু উত্তর আমেরিকায়।
এদেশে পাড়ি দিতে দিতে ভাবি আহা নতুন নতুন আবার কত কিছু শিখতে হবে রে! নিজের নাম ত দিব্যি মুখস্ত এখন। এরই ভেতর সংসারে লোক সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে কনফিউশনও। সন্তানদের বন্ধুরা আমাকে দুটো নতুন নামে ডাকে এখন। অনেক যোগ–বিয়োগ করে বাচ্চাদের নাম রেখেছিলাম। দুজনের নামই শুধু দুটো শব্দের বিন্যাসে রাখা। ফলে দেখা গেল এদের কোন মিডল নেম নেই। স্কুলের বন্ধুরা তো সেসবের বিন্দু মাত্রও জানে না। ওদের এটা জানার প্রয়োজনই বা কি? আমি ওদের ডাকে এখন দুটো নামেই সাড়া দেই। আর আমার সন্তানদের মিষ্টি হাসি উপভোগ করি। এরা বুঝে গেছে আমার নামে অনেক ভাঁজ।
এরা এটুকুও বুঝে গেছে যে, অভিবাসিদের নাম শুনলেই তাদের আদিবাস আঁচ করা যায়, অনেকটা। 'সিভিক্স এন্ড ক্যারিয়ারস প্রোজেক্ট' এ কাজ করতে গিয়ে এরা জেনেছে বেসিভাগ চাইনিজ বংশোদ্ভূতরা কেন ইংরেজি নাম বেছে নেয় এখানে। ওরা কেন ইংরেজি নামের পাশাপাশি নিজের জন্মগত নামটাও রাখে। ওদেরকে নাম জিজ্ঞেস করলে বলে আমার ইংলিশ নাম ‘এই’ আর চাইনিজ নাম ‘ওটা’। এদের নাম এডপশন নিয়ে লেখার অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তা  আমার এত্তটুকুও নেই। সুতরাং বিপদ এড়াচ্ছি। তবে আমি চাইনিজ বংশোদ্ভূত অনেক ছোট ছোট বাচ্চাদের সান্নিধ্যে এসেছি। এদের অনেকেরই ডাক নাম আছে। নামগুলো শুনতে বেশ মিষ্টি এবং তাতে রিদমও আছে। অনেকটা এরকমঃ 'টিয়ানটিয়ান', 'ইয়াইয়া' এবং আরও অনেক নাম। সঙ্গত কারণে আমরা যেমন ছোটোবেলায় শুধু সার্টিফিকেটের নামটা খাতায় লিখতাম, এরাও তাই করে। পুবের কালচার?
কাজের মাধ্যমে এই বাচ্চাদের সাথে আমার যোগাযোগ। আমার কর্ম ক্ষেত্রে আমি সংখ্যায়, কালচারে ও রঙ্গের দিক থেকে একা। তবে তা অনুভব করি না, অত সময় কই? অবশ্য উপলব্ধি করি মাঝে মধ্যে। একটু আলাদা ধরনের নামধারী কেউ এলেই আমার কাছে কাগজ পৌঁছে যায় খুব তাড়াতাড়ি, “এই নামটা কিভাবে উচ্চারণ করতে হয়? আমি কি এই নামটা ঠিকমতো বলছি?” মাঝে মাঝে রাগ হয় আমার। আরে বাবা ডেকেই দেখনা, সে ব্যক্তি নিজেই তোমাকে শিখিয়ে দেবে তাঁর নাম! এটা বললে ওরা আমাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে। বলে, “না না বল কি? ফার্স্ট ইম্প্রেশন, নাম টা ঠিক মত বলা চাই। প্যারেন্টদের সাথে একটা ট্রাস্ট-ওয়ারদি রিলেশন বিল্ড করতে হবে”। কি জানি বাপু, মনে হয় পিয়ার-প্রেসার। ইনস্টিটিউশন এর মান ঠিক রাখার যুক্তি। তবে তাই হোক। আমিও চেষ্টা করি নাম গুলো ঠিকমতো উচ্চারণ করে দিতে। তারপর মনে মনে বলি, যাও আমার ঘরে গিয়ে দেখো, অর্ধাঙ্গ কয়বার ‘র’ ও ‘ড়’ শুধরে দিচ্ছে আমার। আর সন্তানেরা ইংরেজি। আর তোমরা কি না নামের উচ্চারণ নিয়ে দিশেহারা! যেন 'কাম নাই তাই ধান ঝাড়!'  
একদিন ব্যক্তিগত পাওনা ছুটিতে সময় কাটাচ্ছি। হঠাৎ ফোন এলো কাজ থেকে। মনে করলাম, নিশ্চয় কোন কিছু ওলটপালট করে রেখে এসেছি। বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘হোয়াট নাউ?” উত্তর এলো, “তোমাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।" একটা নামের বানান জানিয়ে বলল, “এটা কিভাবে উচ্চারণ করো? ছ্যেবর?" আমি বলি, সাবীড়! তারপর দ্বিতীয় নামের বানান দিয়ে, "এটা?" আমার তীক্ষ্ণ উত্তর, “এটা স্প্যানিশ নাম! আলেহান্দ্রকে জিজ্ঞেস করো, আমার উচ্চারণ ঠিক হবে না!“

ক্যামব্রিজ, ওন্টারিও, ক্যানাডা
রচনাকাল: ২০১৪ অগাস্ট ১৫
প্রকাশকাল: ২০১৪ অগাস্ট ১৫
শেষ সম্পাদনা: ২০১৪ অগাস্ট ১৯


Garden Composition: SNC. Photo Credit: VCV.

Sunday, 3 August 2014

জন্মদিন ও প্রতিদিনের জন্য শুভ কামনা

নাজমীন চৌধুরী
August 3, 2014 at 5:22pm
দীপ ও অর্ক দুই ভাই। ওদের সখ্যতা গলায় গলায়। পোঁচানব্বই ভাগ সময়!                                                  
(বনফুলের নিমাই ও বলাই দের মত। তবে লটারি জেতে নাই কেউ এখনো)

ওদের  শৈশব -  
তিন বন্ধু একসাথে। শুধু দুটো চকোলেট সবার জন্যে। সমাধান?

দঃ নিজেকে প্রথমটা। বাকীটা অন্য দুজনের, ভাগে অর্ধেক।
অঃ নিজেকে সান্ত্বনা, ওগুলো বন্ধুদের খুব পছন্দের চকোলেট! দুই বন্ধু = দুটো চকোলেট।

কিশোর বেলা -     
পছন্দের বই (অনেক। কয়েকটা নীচে দেয়া)

দঃ জেরনিমো  স্টিলটন, হ্যারিপটার সিরিজ ---
অঃ গ্রীক মিথলোজি, হাঙ্গার গ্যেম সিরিজ ---

হাই স্কুল, প্রথম বর্ষ - 
বিষয়ঃ রোমিও এন্ড জুলিয়েট

দঃ সারমর্ম জানতে গুগল সার্চ। এই সাহিত্যের যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রস্তুতি।
অঃ বই মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, “যে কোন কোটেশন ও প্রস্ন করো ত! দেখি, আমি রেডি কি না”।

খেলার খবর  –
খেলা-পাগল

দঃ বাস্কেট বলে হাত ভাঙ্গা
অঃ ডজ বলে দাঁত ভাঙ্গা

লঙ টার্ম গোল - 

দঃ অনেক ধনী হবার
অঃ হারিয়ে যাওয়া কিশরগুলকে পথে আনার

সময় দৌড়াচ্ছে, খুব দ্রুত। দীপ একুশ আর অর্ক পনর, এমাসে। ওদের জন্য শুভকামনা, অনন্তকালের!

২০১৪ অগাস্ট ০৩
ক্যানাডা



Lilac Leaves ♥♪♥ Geranium :: Composition: SNC
Photo Credit: SAI, VCV